Thoughts লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
Thoughts লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১

খাদ্যশস্য বাছল কে?

 

হ্যাঁ, আজকের এ লেখার বিষয় খাওয়া। বেঁচে থাকবার জন্য আমাদের খেতে হয়, আবার খাওয়ার সাথে জীভের রসাস্বাদনও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমরা কি খাই তার যদি আমি তালিকা তৈরি করবার চেষ্টা করি তো সে এক বিশাল লিস্ট হয়ে যাবে- তাতে ফল, সবজি, মাছ-মাংস, মসলা কোন কিছুই বাদ পড়বে না। কিন্তু কি কি আমরা খাই না, বিশেষত কি কি ফল ও সবজি আমরা খাই না এর তালিকাও কিন্তু নেহাত কম ছোট হবে না। এর আগের একটি প্রবন্ধে আমি আলোচনা করেছিলাম যে নিয়ার ইস্ট প্রদেশে মানব সভ্যতার প্রথম চাষবাস শুরু হয় বলে বিজ্ঞজনদের ধারণা ( পড়ুন - ইডেন কি তবে…! ); প্রত্যেকটি উৎকৃষ্ট শশ্য, যেমন আপেল, ডুমুর, বাদাম, পেস্তা, আখরোট, ইত্যাদি প্রথম চাষ করা শুরু হয় সেই নিয়ার ইস্ট প্রদেশেই। তবে অ্যানশিয়েন্ট অ্যাস্ট্রোনট থিওরিস্টদের সন্দেহ উপেক্ষা করে আমরা ধরে নিচ্ছি যে পৃথিবীর নানান খাদ্যোপযোগী এবং উৎকৃষ্ট শস্যের বিকাশ (অথবা আবিষ্কার) করার পেছনে প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর কোনও প্রজাতির ভূমিকা ছিল না- যা হয়েছে, আমরা যেমনটা মনে করি তেমন, প্রাকৃতিকভাবেই হয়েছে; নিয়ার ইস্ট প্রদেশের তেমন কোনওই বিশেষত্ব নেই। কিন্তু এক্ষেত্রে আমার নিজস্ব একটি প্রশ্ন বা সন্দেহ রয়েছে। তবে সে প্রশ্ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবার আগে একটি ব্যাপারে একটু লিখতে চাই-

 

খাদ্যশস্য বাছল কে?

 অদ্ভুত ফল ‘ফক্স হেড’ (Image Source- Wikipedia)


আরও পড়ুন- পিরি রেইস এর রহস্যময় মানচিত্র- এ তবে এঁকেছিল কে?

অথবা দেখুন- আমার আঁকা কার্টুন- ইংলিশ রক ব্যান্ডদি বিটলস


আমাদের খাদ্যোপযোগী শস্য 


এখানে ‘আমাদের’ বলতে আমি কিন্তু শুধুমাত্র আমাদের বাঙ্গালীদের, অথবা আমাদের ভারতীয়দের কথা বলছি না, আমি সমগ্র মানবজাতির কথাই বলছি- কারণ এমন অনেক শস্য বা ফলমূল আছে যা আমাদের দেশে পাওয়া যায় না, তাই আমরা ভারতীয়রা খাই না, কিন্তু যে দেশে হয় সেখানকার লোকেরা খান; বা তদ্বিপরীত ব্যাপারটাও হয়ে থাকে। তো আমাদের খাদ্যোপযোগী শস্যের লম্বা তালিকায় এমন অনেক নাম রয়েছে যা দেখতে একদমই ভালো নয়- যারা তা খায়নি কখনও, তাদের মনে সে শস্য দেখলে কখনোই তা খাবার ইচ্ছে হবে না; কিন্তু বাস্তবে তা খাদ্যোপযোগী এবং অত্যন্ত উপকারী। ইন্টারনেট ঘেঁটে আমি এমন কিছু শস্যের নাম ও ছবি জোগাড় করেছি-

 

খাদ্যশস্য বাছল কে?
Image Source- Wikipedia

ডুরিয়ান (Durian) - দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার একটি ফলের প্রজাতি যা দেখতে একদমই ভালো নয়। অনেকে বলেন এই ফলের গন্ধ (বা দুর্গন্ধ!) নাকি ব্যবহৃত, নোংরা মোজার মত।





 

খাদ্যশস্য বাছল কে?
Image Source- Wikipedia

পিটায়া (Pitaya) - ক্যাকটাস এর একটি প্রজাতি যাকে ‘ড্র্যাগন ফ্রুট’ ও বলা হয়ে থাকে। ছবি দেখে তো একে মোটেই সুখাদ্য বলে মনে হচ্ছে না, কিন্তু এটা খাওয়া হয়।



 



খাদ্যশস্য বাছল কে?
Image Source- Wikipedia

হর্নড মেলন (Horned Melon) - মূলত আফ্রিকান ফল, তবে ক্যালিফোর্নিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ইত্যাদি দেশেও পাওয়া যায় এবং সেখানকার অধিবাসীরা উৎসাহের সাথে খেয়ে থাকেন।


 


খাদ্যশস্য বাছল কে?
Image Source- Wikipedia

বুদ্ধের হাত (Buddha’s Hand) - এ ফল দেখতে অতি কদাকার হলেও এর গন্ধ খুবই সুন্দর এবং চীন ও জাপানে এর খুব ব্যবহার এবং প্রচলন।





 

খাদ্যশস্য বাছল কে?
Image Source- Wikipedia

নোনী ফল (Noni Fruit) - পুরো এশিয়া জুড়ে প্রাপ্ত এ ফল দেখতে কদাকার কিন্তু এর বড়ই উপকার। এটি মূলত কফি ফ্যামিলির ফল।

 




খাদ্যশস্য বাছল কে?
Image Source- Wikipedia

ডালসি (Dulse) - আদপে এক ধরনের অ্যালগি, কিন্তু সবজি হিসেবে নানা জায়গায় খাওয়া হয়ে থাকে। আইল্যান্ড এর লোকেরা একে বাটার মাখিয়ে খায়।

 

আরও পড়ুন- কি ছিল ইডেন? মানবসভ্যতার সব রহস্য কি তবে লুকিয়ে আছে এখানেই?

অথবা দেখুন- আমার আঁকা কার্টুন- অভিনেতা সোনু সুদ


ফল ও সবজি যা খেলেই ক্ষতি

 

এবারে আসি একদমই উল্টো প্রকারের শস্যের কথায়। সারা পৃথিবী জুড়ে এমন প্রচুর ফলমূল রয়েছে যা দেখতে খুবই সুন্দর, দেখলেই খেতে ইচ্ছে করবে; কিন্তু সাবধান, ওসব খেলেই ক্ষতি, এমনকি যেতেও পারেন মারা! এবারে আমরা দেখব তেমনই কিছু ফলমূল যা দেখতে ভাল, কিন্তু তা খাদ্য নয়-

 

খাদ্যশস্য বাছল কে?
Image Source- Plants Database

স্ট্রিচনিন (Strychnine) - সুন্দর দেখতে এই ফলের গাছ মূলত অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাওয়া যায়। কিন্তু এর ফল এতটাই বিষাক্ত যে এ দিয়ে ইঁদুর মারার বিষ তৈরি করা হয়।





 

খাদ্যশস্য বাছল কে?
Image Source- F.A.O.

জাট্রোফা (Jatropha) - সুন্দর এই ফলের গাছ পুরো পৃথিবীতে পাওয়া যায়। এর সুন্দর, হলদে, মিষ্টি ফলে রিচিন (Ricin) নামের এক বিষাক্ত পদার্থ থাকে যার কারণে বমি, ডায়রিয়া থেকে কিডনি নষ্ট অবধি হতে পারে।

 




খাদ্যশস্য বাছল কে?
Image Source- Wikipedia

ইউরোপিয়ান স্পিন্ডল (European Spindle) - মনোরম এই গাছের সুন্দর ফুল ও ফলে নানারকম বিষাক্ত পদার্থ থাকে যার ফলে নানান শারীরিক অসুবিধে ও মৃত্যুও হতে পারে।

 




খাদ্যশস্য বাছল কে?
Image Source- Wikipedia

ম্যাঞ্চিনিল বিচ অ্যাপেল (Manchineel Beach Apple) - গিনেস বুকে ‘পৃথিবীর সবচাইতে ভয়ঙ্কর গাছ’ বলে উল্লেখিত ফ্লোরিডা ও ক্যারিবিয়ান প্রদেশের এই গাছে সবুজ ও মিষ্টি এক ধরনের আপেল হয় যা খেলে মৃত্যুও হতে পারে। একে ‘ছোট মৃত্যুর আপেল’ ও বলা হয়ে থাকে।

 



খাদ্যশস্য বাছল কে?
Image Source- Wikipedia

মেজেরিয়াম (Mezereum) - ইউরোপ এবং দক্ষিণ এশিয়ার এই গাছের ফল খুবই লোভনীয়- অনেকটা চেরির মতো দেখতে। কিন্তু এর ফল খুবই বিষাক্ত, এমনকি এর ডাল ধরলেও হাতে চুলকুনি, জ্বালা ও র‍্যাশ হয়ে যেতে পারে।



 




খাদ্যশস্য বাছল কে?
Image Source- Wikipedia

হোলি (Holly) - এ গাছের লাল লাল ফল দেখলেও চেরির কথা মনে পড়ে যায়, কিন্তু খেলে বমি ও পেট খারাপ হয়ে থাকে। এই ফল কুড়িটির বেশি খাওয়ার ফলে শিশুদের প্রাণহানির আশঙ্কা হতে পারে।

 



আরও পড়ুন- পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাসের নানান মানবসভ্যতা

অথবা দেখুন- আমার আঁকা কার্টুন- গায়ক এল্টন জন


কিছু কথা...

 

আমরা দেখলাম সারাটা পৃথিবী জুড়ে যেমন প্রচুর এমন শস্য, ফল-সবজি ইত্যাদি রয়েছে যা মানুষের খাদ্যোপযোগী, আবার এমনও অনেক প্রজাতি রয়েছে যা খেলে মানুষের ক্ষতি তো বটেই, মৃত্যুও হতে পারে। কিছু ফল ও সবজি এমন রয়েছে যা দেখলে আর যাই হোক আপনার তা খাবার কথা মনে হবে না, অথচ তা খেলে আপনার উপকার। আবার এমনও কিছু ফলমূল রয়েছে যা দেখলে আপনার খেয়ে দেখতে ইচ্ছে করবে, কিন্তু খবরদার, তাতে আপনার ক্ষতি!

 

এমন সব কান্ড-কারখানা দেখে আমার মনে প্রশ্ন জাগে যে মানুষ কিভাবে জানলো যে কোন শস্য তার খাদ্য ও কোনটা তার খাদ্য নয়? কোনও কোনও ফল এমনও রয়েছে যা এমনিতে খেলে বিষাক্ত, কিন্তু সামান্য প্রসেসিং এর পরেই তা সুখাদ্য হয়ে যায়- যেমন কাজুবাদাম। ভাবুন না, আমরা যদি একবার জানি যে ‘অমুক গাছের ফল খেলে আমার ক্ষতি হচ্ছে’, সেটাকে তো আর ভেজে বা রোস্ট করে খেয়ে দেখতে যাব না। তবে বিশেষ কিছু ফলের বেলায় আমরা এমন কেন করি? আমেরিকান প্রদেশে ফক্স হেড (Fox Head) নামের এক অদ্ভুতদর্শন ফল হয় যা এমনিতে বিষাক্ত, কিন্তু সেখানকার লোকেরা কাঁচা অবস্থায় (পেকে যাবার আগে) তা খায়, কারণ সে সময় তাতে বিষ থাকে না। এ কথা তাদের কে বলল? আমরা কি কোনওদিন ধুতরা ফল রোস্ট করে খেয়ে দেখতে গিয়েছি যে তখন তা শরীরের কোনও ক্ষতি করে কি না? এখন না হয় আমাদের পরীক্ষাগার আছে যেখানে এসব পরীক্ষা করে দেখে নেওয়া যায়, কিন্তু এসব প্রথা তো কয়েকশো অথবা হাজার বছর ধরে চলে আসছে (সুমেরীয়রাও ভেড়ার মাংস রোস্ট করে বিয়ার দিয়ে খেত), তখন তাদের এসব কে বলে দিল? এমন অনেক প্রশ্ন আছে যার কোনও উত্তর নেই।

 

আরও পড়ুন- বারমুডা ট্রায়াঙ্গল এর সব রহস্য জানতে পারবেন এখানে

অথবা দেখুন- একটি মজাদার কমিকস সিরিজ- গোদামপুরের চিকেরাম



<<Previous Article          <Main Introductory Page>          Next Article>>

মঙ্গলবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১

মুখঢাকনির ক্ষতি-অক্ষতি

 মুখঢাকনির ক্ষতি-অক্ষতি

 

বিগত দেড়-দু বছর ধরে করোনাভাই (রাস) এর কল্যানে দুটো জিনিস আমাদের জীবনের সাথে একেবারে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গিয়েছে, যার সম্বন্ধে কবছর আগে পর্যন্তও আমরা বিশেষ জানতুম না- ফেসমাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার। ফেসমাস্ক তো আগে জানতুম ডাক্তারবাবুরা অপারেশন থিয়েটারে থাকবার সময় পরেন এবং কোথাও দুর্গন্ধ বা বিষাক্ত গ্যাস বের হলে সেখানে যারা যান তারা পরেন। আর তার যে আবার এত রকমের প্রকার হয়, উইন্ডোজ 95, 97, XP, 2007, 2010 ইত্যাদির মত N95, KN95, N100, P95, আরো কত না জানি; এ তো এই কিছুদিন আগেই জানলুম। এবং স্যানিটাইজার এর বিষয়ে তো বিশেষ কিছুই জানতুম না। কিন্তু বিগত দু বছরে অবস্থায় এখন এমন হয়ে গিয়েছে যে কিছুদিন আগেডিজেনামের এক দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার হিন্দি ডাবিং দেখতে দেখতে যখন দেখলুম যে এক চরিত্র হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করল, তো মনটা আনন্দে নেচে উঠলো- যেন বহুদিনের পরিচিত কোন ভাইয়ের সাথে দেখা হয়েছে! আর মাস্ক এর তো কথাই নেই; ব্যাপারটা এখন চশমাওয়ালাদের চশমা পরবার মতো গিয়েছে- মাস্ক পরে থাকতে থাকতে সেটা আর আছে না নেই সেই বোধটাই চলে গিয়েছে। আজ আমার এ লেখার বিষয়ও সেই মাস্কই- মাস্ক পরবার বেশ কিছু লাভ ও ক্ষতি আমি লক্ষ করেছি, তা নিয়েই আজকের এ লেখা।

 

আরও পড়ুন- করোনা কালীন ভ্যাকসিন নিয়ে সেলফিদান এর প্রথা নিয়ে লেখা রম্যরচনাগট জ্যাবড্‌’

অথবা পড়ুন- বিবাহিত পুরুষদের জন্যে লেখা একটি রম্যগল্পরমণে? বুঝিবে শমনে


না হেসেও হাসি

 

কিছুদিন আগে আমি স্কুটি চালিয়ে বাড়ি ফিরছিলুম, যথারীতি মাথায় হেলমেট ও মুখে মাস্ক লাগিয়ে একটা বেশ ডাকাতে চেহারা হয়েছিল। পথে এক স্বল্প পরিচিত ভদ্রলোকের মুখোমুখি হবার পর তিনি আমার দিকে তাকিয়ে ফিক্‌ করে হেসে তার হাতখানা একটু নেড়ে এগিয়ে গেলেন। আমি তো অবাক-এ ব্যাটা তো জন্মেও এমন করেনা। কাছাকাছি কোথাও থাকে, মাঝে সাজে পথে দেখি, ব্যাস্‌ এটুকুই; মৌখিক আলাপ নেইচিন্তায় পড়ে গেলুম, যে হাসলেন কেন- বেশ কিছুক্ষণ ভেবে বুঝলুম যে চোখাচোখি হবার মুহূর্তে মাস্কের আঁশে নাক সুড়সুড় করে উথেছিল, তাতে আমার চোখ একটু ছোট হয়ে গিয়ে থাকবে। মাস্কের কল্যাণে মুখ তো দেখা যায়না, ছোট হওয়া চোখ দেখে ভদ্রলোক ভেবে নিয়েছেন যে আমি তাকে দেখে হেসেছি, বাকিটা ভদ্রলোকের ভদ্রতা। এই বিষয়ে ভাবনাচিন্তার ফলে আমি এই নিষ্কর্ষে পৌঁছলুম যে মাস্ক পরা অবস্থায় কারও দিকে ভদ্রতার হাসি হাসতে গেলে আর কষ্ট করে হাসবার দরকার নেই, চোখ ছোট করে দিলেই হবে!


আরও পড়ুন- নানারকমের হাসির প্রকারভেদ নিয়ে রম্যরচনাহাসি ক্লাসিফিকেশান

অথবা পড়ুন- নতুন রকমের এক টুথব্রাশের কাহিনী ‘দাঁতে বাঁশ


হেসেও না হাসা

 

আর এই তত্ত্বের ফলে একটা উল্টো তত্ত্বও খাড়া করা যায়- যদি আপনি মাস্ক পরে থাকেন এবং সে সময়ে কারও কথায় আপনার হাসি পায় তো বিলক্ষণ আপনি সাইলেন্ট হাসি হেসে দিতে পারেন, সে ব্যাটা বুঝতেও পারবে না। হ্যাঁ, তবে একটা ব্যাপার আছে- চোখ ছোট করা যাবে না। লাগলে একলা ঘরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সেটা নাহয় একটু প্র্যাকটিস করে নিতে পারেন।


আরও পড়ুন- তথ্য অথবা নানা ধরনের ডাটা কি আপনি ভুলে যান? তবে এটা মিস করবেন না

অথবা পড়ুন- বাংলা মজাদার নাটকচিতেন চোর


ভেংচি কাটা

 

মাস্ক পরিহিত অবস্থায় আপনি আর একটা সুবিধা উপভোগ করতে পারেন- কারও কোনও কথা অথবা কাজ পছন্দ না হলে তাকে তার মুখের উপর ভেংচি কেটে দিয়ে অপূর্ব আত্মিক সুখ ভোগ করতে পারেন, সে বুঝতেও পারবে না। কন্ডিশান শুধুমাত্র একটাই- সেই চোখ ছোট করা যাবে না। ঢপ দিচ্ছিনা মশাই, আমি নিজে আমার গিন্নিকে মাস্কড ভেংচি কেটেছি, সে বুঝতেও পারেনি (বুঝতেই তো পারছেন, কাজটায় কত্তটা রিস্ক ছিল)!

 

আরও পড়ুন- বিবাহিত পুরুষদের জন্যে লেখা একটি রম্যগল্পরমণে? বুঝিবে শমনে

অথবা পড়ুন- আমার জন্য গুপি গায়েন বাঘা বায়েন


পরিচয় গোপন

 

মুখে মাস্ক এর সাথে আপনি যদি মাথায় একটা হেলমেট চাপিয়ে দিতে পারেন তবে খুব সহজেই আপনি আপনার পরিচয় গোপন করতে পারেন- চেনা লোকও সহজে আপনাকে চিনতে পারবে না। চিনবে কিভাবে, শুধুমাত্র চোখ দুটো ছাড়া কিছু তো দেখতেই পাবে না। তবে এমন অবস্থায় যদি আপনি কাউকে নিজেকে চেনাতে চান তবে সেটাও বেশ কষ্টকর- কলার চোকলা ছাড়ানোর মতো এক এক করে সব খুললে তবেই আপনাকে চেনা যাবে।

 

আরও পড়ুন- পড়ুন একটি মজাদার কমিকস- গোদামপুরের চিকেরাম

অথবা পড়ুন- ভুতের বক্তব্য জানতে চান? তবে আপনার জন্যে পিরেতেন্টারভিউ- কারিয়া পিরেত


মুখঢাকনির ক্ষতি-অক্ষতি

অসুবিধেগুলো

 

অসুবিধের কথা আর কি বলি, এ সম্পর্কে সবাই ভালভাবেই অবগত আছেন- মাস্কের আঁশে নাক সুড়সুড়, মাস্কের ফিতেয় কানে টান লেগে কান কনকন, মাত্র মাত্র দাড়ি কেটে মাস্ক পরবার পর মাস্ক থুতনিতে ভেলক্রোর মত আটকে যাওয়া, এসব তো কমন। তার ওপর আছে বাজারে গিয়ে জিনিসপত্রের গন্ধ না পাওয়া। এ নিয়ে হোয়াটস্‌অ্যাপে একটা মজাদার জোকস্‌ পড়েছিলুম- এক ভদ্রলোক বাজারে গন্ধ শুঁকে ভালো আম কেনবার জন্য মাস্ক খুলে আম কিনলেন, বাড়ি ফিরে দেখেন তিনি আর কোনও গন্ধই পাচ্ছেন না। তবে মাস্ক এর সবচাইতে বড় অসুবিধেটা বোধহয় আমার মত চশমাওয়ালা লোকেরাই বুঝবেন, মাস্ক পরলেই যাদের খানিকক্ষণ পর পর চশমার কাঁচ ঘোলা হয়ে যায় আর মনে হয়- আহা, চশমার কাঁচেও যদি গাড়ির কাঁচের মত একজোড়া ওয়াইপার লাগানো থাকত, তবে কতই না ভালো হতো!

 

মঙ্গলবার, ১৩ জুলাই, ২০২১

আমার জন্য গুপী গাইন বাঘা বাইন

আমার আজকের লেখার বিষয় নিয়ে কতজনে কতবার কতরকমভাবে যে অলরেডি লিখে ফেলেছেন তা গুণে শেষ করতে গেলে আবার লোক রাখবার দরকার হবে। বিষয়টা আশা করি এ লেখার টাইটেল দেখে এতক্ষণে ধরে ফেলতে দেরি করেননি। আজ্ঞে হ্যাঁ মশাই, আজ আমি সর্ববরেণ্য সত্যজিৎ রায় মহাশয়ের এক অসামান্য কীর্তি গুপী গাইন বাঘা বাইন সিনেমাটি নিয়ে কথা বলার ইচ্ছা প্রকাশ করছি। যখন আমি ছোট ছিলাম আমার এক শিক্ষক মহাশয় কথায় কথায় বলেছিলেন যে গুপী গাইন বাঘা বাইন ফিল্ম সিরিজটি তার অত্যন্ত প্রিয়। আমি তখন তাকে বলেছিলুম, “স্যার, এ তো ছোটদের সিনেমা। আপনি ছোটদের সিনেমাও দেখেন?” সে-বয়সে আমার এটা জেনে বেশ আমোদ হয়েছিল যে আমার শিক্ষক মহাশয়ের মত একজন বয়স্ক লোক গুপী গাইন বাঘা বাইন এর মত ছোটদের জন্য তৈরি সিনেমা দেখেন।

 

সেদিন তিনি আমায় বলেছিলেন, “গুপী গাইন বাঘা বাইন যখন ছোটরা দেখে তখন তা ছোটদের সিনেমা, কিন্তু বড়রা দেখলেই তা বড়দের সিনেমা হয়ে যায়।আমি সেদিন তার কথার মানে বুঝিনি, জিজ্ঞাসা করেছিলুম যে এর মানে কি। তখন তিনি আমায় বলেছিলেন, “বড় হলে সিনেমাটা দেখো তাহলে আমার কথা মানে বুঝতে পারবে।

 

আমার জন্য গুপী গাইন বাঘা বাইন

কেন জানিনা তার কথাখানা আমি ভুলিনিহয়তো সত্যজিৎ রায় আমার প্রিয় লেখকদের একজন তাই। কিন্তু তার কথাটা যে কতদূর সত্যি তা আমি আজ এ বয়সে এসে উপলব্ধি করি। ছোট থেকে আমি যে গুপী গাইন বাঘা বাইন সিরিজের সিনেমাগুলো দেখেছি আমার নিজেরও মনে নেই, এবং প্রত্যেকবারই সিনেমাটি আমার কাছে এক নতুন রূপে নিজেকে মেলে ধরেছে। এই যেমন কাল বিকেলে কোনও কাজ ছিলনা হাতে, ভাবলুম কি করি, যথারীতি হাত চলে গেল মোবাইল ফোন এর দিকে। ইউটিউব খুলে কেন জানিনা গুপী গাইন বাঘা বাইন দেখা শুরু করলুম এবং শেষ পর্যন্ত তাতে আটকে রইলুম। তারপর থেকেই আমার হাত সুড়সুড় করছে এ নিয়ে কিছু লেখার জন্য।

 

তবে আমি সিনেমার পরিচালনা অথবা অভিনেতাদের অভিনয়ের সমালোচনা করবার চেষ্টা করবনা, আমার সে যোগ্যতাও নেই। কাল আমায় সিনেমাটির দু চারটে দৃশ্য বেজায় ভাবিয়েছে। আমি আজ এখানে তা নিয়েই কিছু কথা লিখব।

 

গুপির বাবার কথা মনে পড়ে? ছোট্ট ক্যারেক্টার- মাত্র দুটো সিনেতেই দেখা গিয়েছে, মুখও স্পষ্ট নয়, কিন্তু তা দিয়েই কি নির্মম সত্য জানিয়ে দেওয়া গেল! যখন বটতলার বাবুরা সহজ-সরল, বেসুরো গুপিকে নানারকম ঢপ দিয়ে রাজার কাছে পাঠাবার ফন্দি করলেন, গুপির বাবা তাকে কড়া ধমক দিলেন যে ফের এসব দেখলে তানপুরা ভেঙ্গে ফেলবেন। আমাদের সকলের ছেলেবেলার মতই গুপিও ভাবলে- বাবা আমার ভালো নয়, তিনি ক্রুর, বরং বটতলার সেই মধুরভাষী বাবুরাই তার আসল হিতাকাঙ্খী। কিন্তু যখন গুপিকে রাজা গাধার পিঠে চাপিয়ে বের করে দিচ্ছেন, বটতলার হুঁকোখোর বুড়োর দলের মুখে ফিচেল হাসি ভাসছে, একমাত্র গুপির বাবাকেই নীরবে চোখের জল ফেলতে দেখা গেল। এর মানে কি আর বুঝিয়ে দিতে হবে? মজাটা হচ্ছে এই কথাটা লিখতে ও পড়তে আমাদের যতটা সময় লাগছে, সত্যজিৎ রায় গুপির বাবাকে তার থেকেও কম সময় ধরে প্রজেক্ট করেছেন, মাত্র দুটো ছোট্ট সিন!

 

তারপর বাঘা যখন প্রথমবার নিজের নামখানা বলে। কেউ ভাবতে পেরেছে যেবাঘা বাইননামখানাকে এত সুন্দরভাবে প্রেজেন্ট করা যায়- বয়ে কাঠি, য়ে কাঠি, ঢোলে চাঁটি, বাঘা বাইন।

 

ভুতের নৃত্য- ছেলেবেলায় দেখে মজা পেতুম বেশ কিছু ভূত কি সুন্দর ল্যাগব্যাগ করতে-করতে নাচছে; এখন ভাবি সে যুগে, যখন অ্যানিমেশান, VFX তো কোন ছার, ঠিকমত কালার ফিল্মই চালু হয়নি, এ দৃশ্য সম্ভব হল কিভাবে? আমি ফিল্মমেকিং বিষয়ে ওস্তাদ নই, তাই এ রহস্য আমার আজও অজানা। তারপর ভুতের নাচ ও তার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। সেখানে ভুতের চারটে ক্লাস দেখানো হয়েছে, যথা- উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্ত, সাহেব এবং সুবিধেবাদীগন। উচ্চবিত্ত ভূতেরা মানুষের রাজা, উজিরদের মতই ক্লাসিক্যাল নাচ নাচছেন, মৃদঙ্গের তালে; নিম্নবিত্ত ভূতেরা সাধারণ চাষী ও কর্মীদের মত কাঞ্জিরার তালে তালে নিজেদের জীবনযাত্রা মেলে ধরেছেন; সাহেব ভূতেরা ঘটম্‌ এর তালে নিজেদের অ্যারিস্টোক্রেসি ও ভদ্রতার নিদর্শন দিচ্ছেন; এবং ভূতেদের সুবিধাবাদী ক্লাস (বাবু, শেঠ, জমিদার, প্রচারক ইত্যাদি) তারা মরসিং এর তালে তালে নিজেদের বিশাল বপু নাচাচ্ছেন। সর্বশেষে লাগে গৃহযুদ্ধ, যা অবশ্যম্ভাবী এবং তাতে সবাই মারা যায়। তবে এই যুদ্ধ কিন্তু এক-এক ক্লাস অনুযায়ী এক এক রকম- উচ্চবিত্তরা নাচতে নাচতে সিম্বলিক যুদ্ধ করেন, নিম্নবিত্তরা সত্তিকারের যুদ্ধ ও হাতাহাতি করেন, সাহেবেরা বাকযুদ্ধ করেন ও তাতেই মারা যান ও সর্বশেষে সুবিধাবাদী ক্লাসের বাবু ভূতেরা কিছুই করেন না, শুধুমাত্র অল্প ভুরিতে-ভুঁড়িতে ঠোকাঠুকি করতেই পড়ে যান।

 

তারপর আসি হাল্লার গুপ্তচরের ভূমিকায় চিন্ময় রায়ের কথায়। হাল্লার রাজা জাদুকর বরফির ওষুধের গুনে শুন্ডির দেবে পিন্ডি চট্‌কে, তাই মন্ত্রী তার গুপ্তচরকে পাঠায় শুন্ডিতে খবর নিতে। সে ফিরে এসে বলে শুন্ডিতে সৈন্য নেই, অস্ত্র নেই, হাতি, ঘোড়া, উট কিচ্ছু নেই। তাতে গুপ্তচরের খুশি হবার কথা; কিন্তু মন্ত্রী যখন বলেন, “শুন্ডিতে তবে আছে কি?” তার উত্তরেফসল আছে, আনন্দ আছে, খুশি আছেইত্যাদি বলতে বলতে গুপ্তচর কোথায় যেন হারিয়ে যায়। পেটের ক্ষিদে যে জয়ের আনন্দকেও ভুলিয়ে দেয়!

 

আর একটি জিনিসের উল্লেখ করে এ লেখা শেষ করব। সিনেমার শেষে যখন শুন্ডির রাজা গুপির সাথে মেয়ের বিয়ে দিতে চান ও বাঘা তাতে রেগে যায়, হাল্লার রাজা জিজ্ঞাসা করেন, “রাজকন্যে কি কম পড়িয়াছে?” এ ডায়ালগটা তো অন্যভাবেও বলা যেত, কিন্তু এভাবে কেন বলা হলো তা আমি বুঝতে পারিনি। এ যেনআলু কি কম পড়িয়াছের মতন ব্যাপার; তবে কাজটি যখন স্বয়ং সত্যজিৎ রায় করেছেন নিশ্চয় এর কোন গুঢ় অর্থ আছে যা আমি বুঝতে পারিনি। পাঠককুলের কেউ যদি এ ব্যাপারে আমায় সহায়তা  করেন বাধিত হব।