বঙ্গ সাহিত্যে ভূতের রঙ্গ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বঙ্গ সাহিত্যে ভূতের রঙ্গ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২১

গেছো ভূত

গেছো ভূত

 

ভুত-প্রেত রোজ রোজ এলে লোকে ভয় পেতেই পারে, তাই ভুত-প্রেত নিয়ে এখানে রোজ রোজ কাটাছেঁড়া করিনা। কিন্তু কিছুদিন আগেই ভূত চতুর্দশী চলে গেল- এদিন ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ সহ যত শত সোশাল মিডিয়া রয়েছে, সর্বত্র দেখি ভূত-প্রেতের ছড়াছড়ি। এসব দেখেশুনে আমার ভেতরের প্রেতপ্রেমী ঋতম আমায় বলল, ‘আর কতদিন নির্ভূত হয়ে থাকবে? এবার তুমিও ভূত নিয়ে কিছু একটা লিখে ফেলো’। তা নিজের অন্তরমনের কথা তো আর উড়িয়ে দেওয়া যায়না, তাই ভাবলুম ‘বঙ্গ সাহিত্যে ভুতের রঙ্গ’কে আর এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাক। তো ভেবে চিন্তে ঠিক করলুম যে এবারের বিষয় হোক ‘গেছো ভূত’।


আরও পড়ুন - ভূত কিসে হয়? বাংলা সাহিত্যে খুঁজে পাওয়া প্রেততত্বের নানা ধারনা জানুন


নামটা শুনেই বুঝতে পারা যায় যে গেছো ভূত হচ্ছে এমন একটা ভূত যে গাছে থাকে। তা গেছো ভূত গাছে থাকে তো বুঝলুম, কিন্তু কেন সে গাছে থাকে, বা গাছে থাকলেই তার নাম গেছো ভূত হয়ে যাবে কেন তা আমি বহুদিন অবধি জানতুম না। কারণ সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ মহাশয় এর কল্যাণে এ খবরখানা অনেকদিন আগেই আমার জানা হয়ে গিয়েছিল যে ভূত মাত্রেই গাছে থাকে- ব্রহ্মদৈত্য বেলগাছে, পেত্নী শ্যাওড়া গাছে, কারিয়া পিরেত তালগাছে, ইত্যাদি। এছাড়া মানুষ মনুষ্যত্বের লেভেল পার করে ভূতত্ত্ব প্রাপ্ত করলেই সে বাস করবার জন্য একখানা গাছ খুঁজে নেয় (বিশ্বাস হচ্ছে না? ‘কেকরাডিহির বৃত্তান্ত’ পড়ে দেখুন)। তা এমনটাই যদি হয়ে থাকে, তাহলে গেছো ভূতের স্পেশালিটিটা কোথায়? ছেলেবেলায় ভাবতুম বদমাইশি করলে মা যেমন আমায় বলতেন- ‘গেছো ছেলে একেবারে’, গেছো ভূতও হয়তো তেমনই ভূত সমাজের অত্যন্ত পাজি ভূত যে সারাটা দিন বদমাইশি করে বেড়ায় বলে গুরুভূতেরা তাকে ‘গেছো ভূত’ আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু পরে জানলুম যে কিস্‌সা কুছ অওর হি হ্যায়।

 

আরও পড়ুন - পড়ুন একটি মজাদার লেখা বিখ্যাত ভূতের রাজার ব্যাপারে


নানান পুঁথিপত্র, গাল-গল্প ও লোকগাথা থেকে জানা যায় যে-

 

গেছো ভূত হন তারা-

গাছে যান মারা যারা।

তারা থাকে গাছ-ডালে লট্‌কে-

আর দেন ঘাড়খানা মট্‌কে।

ওঠে নামে বেয়ে গাছ-কান্ড,

দেখে ফেললেই কাজ পণ্ড।

 

তো যেসব লোকের গাছে মৃত্যু হয় তারাই গেছো ভূত হন; কিন্তু গাছে কিভাবে একজনের মৃত্যু হতে পারে? গাছ তো আর কাউকে মেরে খেয়ে ফেলতে পারে না- তো গাছের ডালে যারা ফাঁসি-টাসি দিয়ে আত্মহত্যা করেন তারাই গেছো ভূত হন। এখন যেহেতু এমন কেস গ্রামে-গঞ্জেই বেশী হয়ে থাকে তাই গেছো ভূতেদের ঠিকানাও গাঁয়েই বেশী হয় (অবিশ্যি শহরে বিজলি বাতির কল্যাণে ভুত-প্রেত আর দেখা যায়ই কোথায়)। ভূতেদের মূল কাজ লোকেদের ভয় দেখানো- গেছো ভূতেরাও তা করে থাকে। কিন্তু কিভাবে?- আঁধার রাতে একলা কোনও ব্যক্তি যখন সেই অভিশপ্ত গাছ, যেখানে গেছো ভূতের বাস, তার পাশ দিয়ে যায়- তখনই গেছো ভূত টপ্‌ করে ফাঁসিস্থ হয়ে গাছ থেকে তার সামনে ঝুলে পড়ে। ব্যাস, কেল্লা ফতে, ভয়ের চোটে সে লোক মাথা ঘুরে সেখানেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। এছাড়াও শোনা যায় যে এরা গাছ বেয়ে সরসর করে ওঠানামা করে থাকে, এবং এ সময় তারা থাকে উল্টো, অর্থাৎ তাদের মাথা থাকে নিচে এবং পা থাকে ওপরে- অনেকটা টিকটিকির মতো। ওরে বাবা রে, কি ভয়ের ব্যাপার!

 

আরও পড়ুন - কারিয়া পিরেত এর নাম শুনেছেন? জানুন এই ভূতটির কথা



গেছো ভূত


আরও পড়ুন - ‘পেত্নী’ তো অনেককেই বলে থাকেন, ভাল করে তার কথা জানুন


গেছো ভূত এর নাম শুনলেই কেন জানিনা আমার গেছোদাদার কথা মনে পড়ে যায়। গেছোদাদাকে চিনতে পারছেন তো? সেই যে সুকুমার রায়ের ‘হযবরল’ গপ্পের রুমাল, যে হয়ে গিয়েছিল বেড়াল, গেছোদাদার কথা বলেছিল। যদিও তাকে ভূত বলে পরিচয় দেওয়া হয়নি, কিন্তু মশাই, তার মধ্যে কি কম ভূতত্ত্ব ছিল? সে যে কোথায় থাকে কিছুতেই জানা যায় না, তার সাথে দেখা হবারই জো নেই-

 

যদি যাই উলুবেড়ে-

তিনি থাকেন মতিহারি,

মতিহারি গেলেও তাকে

দেখতে আমি না পারি।

থাকবেন তিনি তখন

রামকিষ্টপুর-

কষ্ট করে গেলুম সেথা,

হয়ে গেলো দুপুর।

গিয়ে শুনি গেছেন তিনি

কাশিমবাজার-

গেছোদাদার সঙ্গে দেখা

হবার নেই যো আর।

 

এই যে ইচ্ছে থাকলেও, চেষ্টা করলেও, দেখা না পাওয়া- এ যে বেজায় ভূত-ভূত একটা গন্ধ, আর এ গন্ধটা খুবই সন্দেহজনক! তাই গেছোদাদার কথা শুনলেই আমার গেছো ভূত এর কথা মনে পড়ে যায়। তবে গেছোদাদা কি আসলেই গেছো ভূত? নাকি গেছোদাদা গেছোদাদাই, গেছো ভূত আলাদা- এ আমার জানা নেই। আপনি কি জানেন? তবে কষ্ট করে আমায় একটু জানিয়ে দেবেন। 

  

আরও পড়ুন - মেছোভূত এর কথা কতটা জানেন? জানুন।



<<Previous Article            <Main Introductory Page>            Next Article>>

মঙ্গলবার, ১৭ আগস্ট, ২০২১

মেছোভূতের দেখা পাওয়া

প্রেতেন্টারভিউ - মেছোভূতের দেখা পাওয়া

 

মাছ আমি খুব ভালো চিনিনে, এজন্য প্রায়ই গিন্নীর কাছে গঞ্জনা শুনতে হয়- বাঙালি হয়ে ভালো মাছ কিনে আনতে পারিনে বলে। আমার বাবা ও শ্বশুরমশাই মাঝেসাজে এ বিষয়ে আমায় জ্ঞান দেবার চেষ্টা করেছেন তবে বিশেষ কাজ হয়নি। কি করব, টিপিকাল বাঙালি বাবুর মত লুঙ্গি পরে সকালবেলা এক হাতে বাজারের থলে নিয়ে মাছের কানকো তুলে তার দোষ-গুণ সহ চৌদ্দগুষ্টির হিস্ট্রি খুঁজে আমি বের করতে পারিনা। অগত্যা যা হবার তাই হয়! তা সেদিন বাড়ী ফেরার পথে নদীর পাড়ে এক জেলের কাছে বেশ কমদামে বড়সড় একখানা লোকাল কাতলা মাছ পেয়ে গিয়েছিলাম, সাথে সহৃদয় এক ব্যক্তির দেখাও পাই যিনি সে মাছের ওই কানকো টানকো দেখে সার্টিফাই করে দিয়েছিলেন যে ও একদম এক নম্বর মাছ। তাই এক হাতে মাছ নিয়ে ঝোলা কাঁধে বেশ ফুরফুরে মনে বাড়ি ফিরছিলুম যে গিন্নীর কাছে আজ বেশ দর বাড়ানো যাবে। এসব ভাবতে ভাবতে অন্ধকার পথ দিয়ে বাড়ি ফিরছি হঠাৎ অনুভব করলুম কে যেন আমার পেছু নিয়েছে। থেমে গিয়ে পেছন ঘুরলুম-

 

আমি - কে আসছে পেছনে?

 

(কোনও উত্তর নেই)

 

আমি - আবার বলছি, কে আসছে পেছনে? ভালো হবে না কিন্তু বলে দিলুম।

 

(কোনও উত্তর নেই)

 

আমি - (ভাবলুম) তবে বোধহয় মনের ভুল।

 

(আবার পথ চলা শুরু করলুম, এবারে খানিকক্ষণ পর মাছের থলিখানা কে যেন টানতে লাগলো)

 

আমি - (ভাবলুম) কে আবার ব্যাগ টানে বাপু? চোর-ডাকাত হলে তারা তো মাছের থলি টানে বলে শুনিনি! উঁহু, এ তো অন্যরকম মনে হচ্ছে! গন্ধটা সন্দেহজনক!

(বললুম) কে বাপু থলে টানছো? ওতে টাকা পয়সা কিছুই নেই। শুধু একটা মাছ...

 

মেছোভূত - (অন্ধকার থেকে আওয়াজ আসে) ওরে আমায় একটু মাছ দিবিনে?

 

আমি - (ভাবলুম) মাছ চাইছে! এ তো মেছোভূত মনে হচ্ছে! না, একটু খেলিয়ে দেখি।

(বললুম) কে তুমি হে, কোনও মেছোভূত নাকি?

 

মেছোভূত - (অদৃশ্য থেকেই) তা ভুল বলিসনি। মাছ খেতে আমার বেজায় ভালো লাগে। হ্যাঁরে, তা আমায় একটু মাছ দিবিনে? বেজায় সুভাষ ছাড়ছে।

 

আমি - হ্যাঁ, তা তোমার দৃষ্টি যখন এতে পড়েছে, দিতে হবে বৈকি! কিন্তু দেবটা কাকে? কাউকেই যে দেখতে পাইনে! সামনে এসে দেখা দাও, তবে না দিতে পারি।

 

(অন্ধকার থেকে ধীরে ধীরে একজন লোক এগিয়ে এলো- খুবই লম্বা, বেজায় রোগা, হাত পা গুলো কাঠি কাঠি, কি পরে আছে বোঝা যাচ্ছে না)

 

মেছোভূত - নে, আসলুম, ভয় পাসনি, কিছু করবনাকো। দে, এবারে একটু মাছ দে রে বাবা।

 

আমি - শোনো, একটু নয়, তোমায় আমি গোটা মাছটাই দিয়ে দিতে পারি, কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে।

 

মেছোভূত - গোটা মাছ? দিবি? দিবি? দিবি? বল, বল, কি করতে হবে? কি করতে হবে?

 

আমি - তেমন কিছু না, আমি তোমার এক ইন্টারভিউ নিতে চাই। মানে আমি তোমায় কিছু প্রশ্ন করব, তুমি ঠিক ঠিক তার জবাব দেবে। ব্যস্‌, তাহলেই আমি তোমায় এই গোটা মাছখানা দিয়ে দেবো। বলো রাজি?

 

মেছোভূত - রাজি। রাজি। রাজি। খুব রাজি। ওরে বাবা, একটা গোটা মাছ! বল, বল, কি প্রশ্ন বলবি বল।

 

আমি - এখানে নয়, চলো কোথাও গিয়ে বসা যাক।

 

(পথের ধারে একখানা গাছের তলায় দুজনে গিয়ে বসি)

 

আরও পড়ুন - বাংলা মজাদার নাটক 'চিতেন চোর'

অথবা পড়ুন - সামাজিক অবস্থা নিয়ে লেখা সুন্দর কবিতা ‘গাছের মত অত্যাচারিত মানুষ’


মেছোভূতের দেখা পাওয়া



আমি - শোনো, তুমি এক কাজ করো, মাছখানা নিয়েই নাও। তুমি যেমন ছোঁক ছোঁক করছো, নইলে তোমার ধৈর্যে কুলোবে না।

 

মেছোভূত - দে! দে! দে! দে! দে!

 

(মাছটা পেয়েই মেছোভূত হাপুস-হুপুস করে পুরো মাছটা খেয়ে ফেলে, একটু কাঁটাও অবশিষ্ট থাকে না)

 

আমি - এবারে বলো তোমার নাম কি?

 

মেছোভূত - হেঁ- হেঁ- হেঁ- আমার আবার নাম কি? মেছোভূত রে, মেছোভূত। আমাদের আলাদা কোনও নাম হয়না। কখনো ভূতেদের এমন নাম শুনেছিস- কালু মামদো, রাজু ব্রহ্মদত্তই, গবা মেছো অথবা রানী শাকচুন্নি? আমাদের নাম ওই ক্লাস দিয়েই বিচার করা হয়, আলাদা নাম থাকে না।

 

আমি - আচ্ছা, আচ্ছা, বুঝলাম, বুঝলাম। একটা প্রশ্নের উত্তর দাও, তুমি মেছোভূত হলে কি করে? মানে সবাই তো আর মারা গেলেই মেছোভূত হয় না, তুমি কেন হলে?

 

মেছোভূত - শোন, জীবদ্দশায় আমি থাকতুম ভেড়ভেড়ী গাঁয়ের এক কোণে এক ছোট্ট ঝুপড়িতে। তিনকূলে কেউ ছিলনা আমার, আমি একাই থাকতুম। আর কোনও নেশা-ভাংও করতুম না, থাকার মধ্যে নেশা ছিল দুটোই- মাছ ধরা আর মাছ খাওয়া, মাছ খেতে আমি খুব ভালবাসতুম। একদিন খবর পেলুম পাশের গাঁয়ের লালদীঘিতে বড় বড় মাছ ঘাই দিচ্ছে, ব্যাস্‌, ছিপ বড়শি নিয়ে চলে গেলুম। সেই দিনটা ছিল ভয়ের- মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছিল, সাথে বড় বড় বাজ। তা সত্বেও ছিপ নিয়ে গেলুম বসে। হঠাৎ কোথাও এক বিশাল বাজ পড়ল, তারপর আর কিছু মনে নেই। যখন জ্ঞান ফিরল দেখি পাশে আমার মরা শরীরটা। ব্যস্, তখন থেকে আমি মেছো। কেন হলুম, অন্য কিছু হলুম না কেন, অতশত জানিনা বাপু।

 

আমি - আচ্ছা, বেশ, বুঝলুম। এবারে বলো তোমার মানুষ জীবন বেশি ভালো ছিল নাকি এই ভূত জীবন?

 

মেছোভূত - ভুত- ভুত- ভুত- ভুত জীবন।

 

আমি - কেন?

 

মেছোভূত - ছ্যাঃ ছ্যাঃ ওটা আবার একটা জীবন ছিল? হেথা যাবিনে, হোথা যাবিনে; এই কবিনে, ওই কবিনে; এই খাবিনে, ওই খাবিনে; এই করবিনে, ওই করবিনে; কত শত ঝামেলা, কত শত জ্বালা! এখনই দিব্যি আছি- বাধা নেই, নিষেধ নেই, কেউ বেশি কথা কইতে এলে মট্‌ করে দাও ঘাড় মটকে, ঝামেলা শেষ!

 

আমি - ওরে বাবা রে! তা তুমি কোন মাছ খেতে পছন্দ করো?

 

মেছোভূত - ওরে আমি মেছোভূত রে, মেছোভূত। আমি কোন মাছটা খাই না তাই বল। সব খাই, যে মাছই পাই, কপাৎ করে খেয়ে নিই। চেয়ে খাই, কেড়ে খাই, চুরি করে খাই, না পেলে ধরেই খাই- তবে ভাজাটা খেতে সবচাইতে ভালো লাগে, আহা! আহা!

 

আমি - আচ্ছা, এরপর কি করবে? মানে আমি চলে যাবার পর?

 

মেছোভূত - কেন, মাছ খুঁজতে বেড়োব!

 

আমি - এই গোটা মাছটা খাবার পরও আবার?

 

মেছোভূত - ধুশ্‌! ওরে, এ তো নশ্যি! আরও কত খেতে পারি।

 

আমি - ঠিক আছে, তবে আমার কথা শেষ। তুমিও যাও, আমিও বাড়ি যাই।

 

মেছোভূত - আচ্ছা বেশ।

 

(মেছো ভূত অদৃশ্য হয়, আমিও গিন্নিকে আর মাছ দিয়ে দর বাড়াতে পারলুম না একথা ভাবতে ভাবতে বাড়ির পথে এগোলুম।)

 

আরও পড়ুন - নানারকমের হাসির প্রকারভেদ নিয়ে রম্যরচনা ‘হাসি ক্লাসিফিকেশান’

অথবা পড়ুন - বিবাহিত পুরুষদের জন্যে লেখা একটি রম্যগল্প ‘রমণে? বুঝিবে শমনে’


<<Previous Article            <Main Introductory Page>            Next Article>>

সোমবার, ৯ আগস্ট, ২০২১

মেছো ভূত

বেশ কিছুদিন এদিক সেদিক নানান বিষয়ে ঘোরাঘুরি করবার পর আজ আবার ভূত। কোন ভূতকে নিয়ে লেখা যেতে পারে এ নিয়ে ভাবনাচিন্তা করছি, এমন সময় নাকে এল বেজায় সুন্দর একটা গন্ধ- রান্নাঘরে গিন্নি কিছু একটা ভাজছেন। আহা, ভাজাভুজি খেতে আমি বড়ই ভালোবাসি। খাতা-কলম ফেলে মনে মনে ভাবছি যে যাই হেঁসেলে উঁকি দিয়ে দেখি কি ভাজা হচ্ছে, আর গিন্নিকে ম্যানেজ করে যদি একটা ভাজা পাওয়া যায় তবে তো কেয়াবাত! মনে মনে এমন সব প্ল্যান প্রোগ্রাম চলছে এমন সময় হাতে একটা প্লেট নিয়ে গিন্নি নিজেই এসে হাজির হলেন। প্লেটখানা বাড়াতেই দেখি- আহা, তাতে গরমাগরম এক টুকরো মাছ ভাজা। গিন্নি বললেন, “তুমি তো মাছভাজা খুব ভালোবাসো, তাই নিয়ে এলুমতারিয়ে তারিয়ে মাছভাজাটা খাচ্ছি এমন সময় এতক্ষণের চিন্তা-ভাবনার সমাধান পেয়ে গেলুম- আজ যাকে নিয়ে লেখা হবে তিনি হলেন বঙ্গবিখ্যাত মেছোভূত।


আরও পড়ুন - ভূতের রাজার কাহিনী।

অথবা পড়ুন - কি ছিল ইডেন? সত্যিই কি তা ছিল ঈশ্বরের তৈরি কোনও বাগান?

মেছো ভূত


মেছোভূত নামখানার সাথে আমরা বেশ ভালোভাবেই পরিচিত।মেছোভূত’, অর্থাৎ কিনামাছ খোর ভূত’- যে ভূত মাছ খেতে বেজায় ভালোবাসে। গ্রামে-গঞ্জে কথায় আছে যে রাতের বেলায় যদি ঝোলায় মাছ নিয়ে বাড়ি ফেরেন, তবে সে ঝোলায় ভুতের অদৃশ্য টান পরবার এভরি পসিবিলিটি। তবে মাছের ঝোলায় টান পড়লেই যে সে টান মেছোভূতে দেবে এমন কোনও মানে নেই। সব ভূত মাছ খায় না, তবে মাছওয়ালা ঝোলায় টান সবাই দেয়। মেছোভূত শুধু তাদের তাদেরই বলা হয় যারা মাছ খায়; শুধুমাত্র খায়ই না, এনারা মাছ খেতে বেজায় ভালোবাসেন, আর সে মাছ ভাজা হলে তো কথাই নেই। গ্রাম বাংলায় একটা কথা চালু আছে বলে শুনেছি- রাতের বেলায় মাছ কেনা বা ভাজা যাবেনা, কারণ, সেই মেছোভূত! মেছোভূতেরা নাকি মাছের গন্ধে বেড়াল এর মত ঘুরঘুর করে; শুধু তাই নয়, মাছের সন্ধান পেলে তারা নাকি নাঁকি গলায় মাছ চাওয়াও শুরু করে দেয়- ওঁরেঁ আঁমাঁয়ঁ মাঁছঁ দিঁবিঁ নাঁ নাঁকিঁ...।

 

আরও পড়ুন - ভুতোৎপত্তি- বঙ্গ সাহিত্যের নানা মত অনুযায়ী ভূত কিভাবে হয়।

অথবা পড়ুন - বারমুডা ট্রায়াঙ্গল এর নানান অজানা রহস্য ও কাহিনী।


এবারে প্রশ্ন মেছোভূত করা হয়? এ ব্যাপারে একটা কথা প্রথমেই জানিয়ে রাখি, বাংলার বাইরে মেছো অথবা মাছ খোর ভুতের কোনও কনসেপ্ট আছে বলে কিন্তু কখনও শুনিনি; এবং বাঙালি আর মাছ তো অবিচ্ছিন্ন। তাহলে এটা বলা যেতেই পারে যে শুধুমাত্র বাঙালিরাই মেছোভূত হন। তাও সবাই নয়, এমন কেউ যে জীবদ্দশায় মাছ ছাড়া খেতেই পারত না এমন লোক মারা যাবার পর মেছোভূত হবে; আর তেমন লোক যদি মাছ ধরতে গিয়ে অপঘাতে মারা গিয়ে থাকে তবে তো আর কথাই নেই।

 

আরও পড়ুন - বঙ্গ সাহিত্যে ভূতের রঙ্গ- বাংলা কল্প কাহিনিতে ভুতেদের ভুমিকা কি?

অথবা পড়ুন - দানিকেনতত্ব- আমাদের মহাকাশজান অবতরন করল ভিনগ্রহে।


বাংলা ভূতের গল্পে এই মেছোভূতেদের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট ও কমিকস স্রষ্টা শ্রী নারায়ন দেবনাথ এর হাঁদা-ভোদা, বাটুল ও নন্টে-ফন্টে সিরিজে প্রায়ই এনাদের দেখা পাওয়া গিয়েছে। লেখক মনোজ বসু এই মেছোভূতেদের নিয়েভুতের মাছ ধরানামের এক বড়ই সুন্দর কাহিনী রচনা করেছেন। এ ছাড়াও নানা গল্পে নানা সময়ে মেছোভূতের দেখা পাওয়া গিয়েছে। সাধারণতঃ এনারা জেলেদের মাছে ভাগ বসাতে চান এবং দরকার পড়লে এ জন্য তাদের ভয় দেখাতেও পেছপা হন না। কিন্তু যদি কেউ এনাদের সাথে একবার দোস্তি করে ফেলতে পারে তবে দেখা যায় যে মাছ শিকারেও এনারা বেশ পটু; কিন্তু ভূত হয়ে আগুন ও লোহা না ছুঁতে পারার কারণে নিজেরা মাছ ভেজে খেতে পারেন না।

 

আরও পড়ুন - রম্যগল্প- 'রমণে? বুঝিবে শমনে।'

অথবা পড়ুন - ষড়যন্ত্রতত্ব- অ্যানসিয়েন্ট অ্যাস্ট্রোনট থিয়োরি নিয়ে কিছু কথা।


শোনা যায় একসময় গ্রামে-গঞ্জে যদি কোনও জায়গা- জঙ্গলের এলাকা, বাঁশঝাড়, ইত্যাদি একবার মেছোভূতের আখড়া বলে চিহ্নিত হয়ে যেত তবে সেখান দিয়ে মাছ নিয়ে যাবার সময় লোকেরা অল্প করে মাছ সেখানে ফেলে দিয়ে যেত, মেছো ভূত কে খুশি রাখার জন্য। এত কিছু বললুম বটে, তবে আমি নিজে কিন্তু কখনও কোনও মেছোভূতকে দেখিনি। আপনি কি তেমন কিছু দেখেছেন? তবে আমায় তা জানাতে ভুলবেন না যেন।

 

<<Previous Article            <Main Introductory Page>            Next Article>>

রবিবার, ২০ জুন, ২০২১

পিরেতেন্টারভিউ - পেত্নী

 [আজকের ইন্টারভিউ করা হয়েছে পেত্নির যদিও সাধারণত ভূতেরা নাকি নাঁকি সুঁরে কঁথা বঁলে থাঁকেঁন, কিন্তু টাইপিং এর সুবিধার্থে চন্দ্রবিন্দুগুলি বাদ দেওয়া হল, দয়া করে কল্পনা করে নেবেন]

 

(অন্ধকার পথে দেবলীনা গজ গজ করতে করতে হাঁটছে। এক হাতে তার বড় একটা টর্চ, আর এক হাতে খাতা-কলম। জীর্ণ এক পোড়োবাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়)

 

দেবলীনা - হুঁহ্‌, নিজে চালাবে ব্লগ আর ভূতের ইন্টারভিউ নেবার বেলায় বউ! কেন বাপু, এ কাজটাও তো নিজেই করতে পারো। আমার পরানে কি ভয় হয় না নাকি?

 

(গেট খুলে ভেতরে ঢোকে)

 

দেবলীনা - অবিশ্যি সে যে নিজেও অনেক ভূতের ইন্টারভিউ নিয়েছে এ কথাও ঠিক, তবে মেয়ে ভূত হলেই আমায় পাঠায়। গতবার শাকচুন্নিররটাও আমায় দিয়ে করালো। কেন, ভূতনি হলে কি তোমায় খেয়ে নেবে নাকি?

 

(এক ঝুল ও ধুলোয় ঢাকা হলঘরে আসে)

 

দেবলীনা - এঁঃ, কি নোংরা চারিদিকে!

          (চিৎকার করে) কই গো, পেত্নীদেবী, আছো নাকি? থাকলে তাড়াতাড়ি এসো, চটপট আমায় তোমার একটা ইন্টারভিউ নিতে দাও। আমায় আবার বাড়িও ফিরতে হবে, গুষ্টির কাজ জমে আছে সেথা। কই, এসো গো।

 

(বাতাস থেকে শব্দ ভেসে আসে)

 

পেত্নী - ও মা, কে এয়েছে। দেখি দেখি, এ যে দেবলীনা, সেই ভূতের ব্লগ থেকে। কি যেন নাম... 

 

দেবলীনা - কিম্ভুতিকিমাকারি গো কিম্ভুতিকিমাকারি, আমার বর চালায়।

 

পেত্নী - হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক ঠিক। তা সে তোমায় পাঠালে কেন? নিজে আসতে পারতো। আহা, কতদিন ব্যাটাছেলে দেখিনি! আহা, বিয়েটা করতে পারলুম না, মরে পেত্নী হয়ে গেলুম!

 

দেবলীনা - (স্বগতোক্তি) ও বাবা, এ পেত্নীবেটির তো খুব ছোঁকছোকানি! ইচ্ছে করছে ঝ্যাঁটা মেরে এ ভুত বিদেয় করি। ও আসেনি, বেশ করেছে। একটু রাগারাগি করি বটে, কিন্তু বর আমার লোক ভাল, চরিত্র মন্দ নয়। ভূতনির দিকেও নজর দেয় না।

 

পেত্নী - কিছু বললে নাকি গো?

 

দেবলীনা - এ্যাঁ? না, তোমায় নয়। তা তুমি সামনে আসছনা কেন? এভাবে কি ইন্টারভিউ হয়?

 

(পেত্নী সামনে এসে দাঁড়ায়)

 

পেত্নী - ইন্টারভিউ নেবে? ওরে, আমার ইন্টারভিউ নিতে এয়েচে রে! আমি যে সেলেব হয়ে গেলুম। কিন্তু এই ময়লায় তুমি বসবে কোথা গো, চলো কোনও রেস্টুরান্টে কপি খেতে খেতে কতা হোক।

 

দেবলীনা - তাহলে হয় তো ভালোই। কিন্তু রেস্তোরাঁ...ব্যাপারটা কেমন হবে না? তুমি যে পেত্নী!

 

পেত্নী - আরে কিচ্চু হবেনা। আমি যতক্ষণ থাকবো আমাদের কেউ দেখতেই পাবে না। চিন্তা নেই, তবে ইন্টারভিউ তো, দাঁড়াও এট্টু বেশ করে মেকাপ করে আসি। একটা বেশ সেলেব সেলেব ব্যাপার আচে না।

 

দেবলীনা - কি আর করব, যাও তাহলে।

 

(পেত্নী অদৃশ্য হয়। আবার খানিক পরই সে এসে হাজির হয়)

 

দেবলীনা - চলো তবে।

 

পেত্নী - ওগো বোকা মেয়ে, হেঁটে যাবে নাকি? আমরা ভূত, আমরা যেথা যাই হয়ে যাই ভ্যানিশ্‌। দাঁড়াও দিকি-

        (মন্ত্র পড়ে) অড়কড় মড়কড় ফড়কড় রাম,

                   মুখের ভেতর ফজলি আম।

                   সেই আমেতে পোকা পাই-

                   সে যে ভূতের ভায়রা ভাই।

                   হিং-টিং-ছট্‌, কড়কে কট্‌,

                   যা হবি, তা হবি, হ চট্‌পট্‌,

                   নিশ্‌-ফিশ্‌-মিশ্‌, বলে ইংলিশ্‌,

                   আমি পেত্নীদিদি হই ভ্যানিশ্‌।

                   হুশ্‌!

 

(পেত্নী ও দেবলীনা ভ্যানিশ্‌ হয়ে যায়। পরমুহুর্তেই দেখা যায় দুজনে এক রেস্তোরাঁয় বসে আছে)

 

পেত্নী - কেমন মজা? ব্যাঙের ভাজা! কেউ আমাদের দেখতে পাচ্ছে না।

 

দেবলীনা - তাহলে ইন্টারভিউ শুরু করি?

 

পেত্নী - হোক! হোক! দাঁড়াও, কিছু খাওয়াই।

 

(পেত্নী টক্‌ করে একটা চুটকি বাজায়, ফশ্‌ করে দেবলীনার সামনে এক কাপ কফি ও এক প্লেট চিকেন কাবাব এসে হাজির হয়)

 

দেবলীনা - ওরেব্বাস্‌! এ তো বেজায় মজা!

 

পেত্নী - হুঁ-হুঁ, বুজবে বাবা! পেত্নী হবার কি সুখ, নাই দুখ!

 

দেবলীনা - তাহলে প্রথম প্রশ্ন- যদিও এটা কৌতুহল থেকেই করছি। তুমি তখন অড়কড় মড়কড় করে ওটা কি বললে?

 

পেত্নী - , ওটা ছিল ভ্যানিশিং মন্তর। ওটা পড়েই আমরা পেত্নীরা অদৃশ্য হয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাই গো।

 

দেবলীনা - , আচ্ছা একটা জিনিস বলো, তুমি পেত্নী হলে কি করে?

 

পেত্নী - মরে।

 

দেবলীনা - না, তা তো জানিই, কিন্তু সবাই তো আর মরবার পর পেত্নী হয়না, তুমি কেন হলে?

 

পেত্নী - ওরে মা রে, কি দুক্কু কি দুক্কু, হাউ মাউ খাউ, দুঃখের গন্ধ পাউ, দুঃখের কান্নায় যে আমি শেষই হয়ে যাউ...

 

দেবলীনা - আহা  কাঁদে না, কাঁদে না, ষাট ষাট।

 

পেত্নী - শোনো, তারাই শুধু পেত্নী হয় মরবার আগে যাদের মনে কোনও অতৃপ্ত বাসনা থেকে যায়। আমারও ছিল, আমি বিয়ে করতে পারলুম না, তাই পেত্নী হলুম।

 

দেবলীনা - আচ্ছা বেশ, পরের প্রশ্ন- পরের জন্মে তুমি কি হতে চাও?

 

পেত্নী - বউ।

 

দেবলীনা - (স্বগতোক্তি) আরে এ তো দেখি বিয়ে ছাড়া কিসুই বোঝে না!

           (জোরে) তা এতই যখন তোমার বিয়ের শখ তো কোনও ভূতকে বিয়ে করে নিলেই পারো!

 

পেত্নী - এটা তো কখনও মাথায় আসেনি! ঠিক তো, যাই, বর খুঁজতে যাই।

 

দেবলীনা - মানে! আরে দাঁড়াও, ইন্টারভিউ এখনও শেষ হয়নি তো!

 

পেত্নী - সে আরেকদিন দেবখন, এখন বর খুঁজতে যাই। থাঙ্ক উ, লাব উ, বাই বাই। ও হ্যাঁ, বিল টা দিয়ে দিও যেন।

 

(পেত্নী অদৃশ্য হয়, সেই মুহূর্তেই ওয়েটার এসে বিল ধরিয়ে দেয়)

 

দেবলীনা - দেখেছ কাণ্ড! এ খাওয়ানো কেমন খাওয়ানো? বিল আমায় দিতে হবে! কিন্তু আমার কাছে যে তাকা নাই! তাহলে?

 

(পেত্নী গেলেন বর খুঁজতে, আর ইন্টারভিউয়ার দেবলীনা টাকার অভাবে বিল দিতে পারছে না,  রেস্তোরাঁতেই বসে আছে। কি হলো তবে? অবশেষে পেত্নী কি ভালো কোনও বর খুঁজে পেল? দেবলীনার বিল কি পে করা হলো? সে কি বাড়ি যেতে পারল? আমি তো জানিনা, কেউ জানতে পারলে আমায় জানাবেন কিন্তু!) 


পেত্নির ইন্টারভিউ



<<Previous Article            <Main Introductory Page>            Next Article>>