মঙ্গলবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২১

গেছো ভূত

গেছো ভূত

 

ভুত-প্রেত রোজ রোজ এলে লোকে ভয় পেতেই পারে, তাই ভুত-প্রেত নিয়ে এখানে রোজ রোজ কাটাছেঁড়া করিনা। কিন্তু কিছুদিন আগেই ভূত চতুর্দশী চলে গেল- এদিন ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ সহ যত শত সোশাল মিডিয়া রয়েছে, সর্বত্র দেখি ভূত-প্রেতের ছড়াছড়ি। এসব দেখেশুনে আমার ভেতরের প্রেতপ্রেমী ঋতম আমায় বলল, ‘আর কতদিন নির্ভূত হয়ে থাকবে? এবার তুমিও ভূত নিয়ে কিছু একটা লিখে ফেলো’। তা নিজের অন্তরমনের কথা তো আর উড়িয়ে দেওয়া যায়না, তাই ভাবলুম ‘বঙ্গ সাহিত্যে ভুতের রঙ্গ’কে আর এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাক। তো ভেবে চিন্তে ঠিক করলুম যে এবারের বিষয় হোক ‘গেছো ভূত’।


আরও পড়ুন - ভূত কিসে হয়? বাংলা সাহিত্যে খুঁজে পাওয়া প্রেততত্বের নানা ধারনা জানুন


নামটা শুনেই বুঝতে পারা যায় যে গেছো ভূত হচ্ছে এমন একটা ভূত যে গাছে থাকে। তা গেছো ভূত গাছে থাকে তো বুঝলুম, কিন্তু কেন সে গাছে থাকে, বা গাছে থাকলেই তার নাম গেছো ভূত হয়ে যাবে কেন তা আমি বহুদিন অবধি জানতুম না। কারণ সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ মহাশয় এর কল্যাণে এ খবরখানা অনেকদিন আগেই আমার জানা হয়ে গিয়েছিল যে ভূত মাত্রেই গাছে থাকে- ব্রহ্মদৈত্য বেলগাছে, পেত্নী শ্যাওড়া গাছে, কারিয়া পিরেত তালগাছে, ইত্যাদি। এছাড়া মানুষ মনুষ্যত্বের লেভেল পার করে ভূতত্ত্ব প্রাপ্ত করলেই সে বাস করবার জন্য একখানা গাছ খুঁজে নেয় (বিশ্বাস হচ্ছে না? ‘কেকরাডিহির বৃত্তান্ত’ পড়ে দেখুন)। তা এমনটাই যদি হয়ে থাকে, তাহলে গেছো ভূতের স্পেশালিটিটা কোথায়? ছেলেবেলায় ভাবতুম বদমাইশি করলে মা যেমন আমায় বলতেন- ‘গেছো ছেলে একেবারে’, গেছো ভূতও হয়তো তেমনই ভূত সমাজের অত্যন্ত পাজি ভূত যে সারাটা দিন বদমাইশি করে বেড়ায় বলে গুরুভূতেরা তাকে ‘গেছো ভূত’ আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু পরে জানলুম যে কিস্‌সা কুছ অওর হি হ্যায়।

 

আরও পড়ুন - পড়ুন একটি মজাদার লেখা বিখ্যাত ভূতের রাজার ব্যাপারে


নানান পুঁথিপত্র, গাল-গল্প ও লোকগাথা থেকে জানা যায় যে-

 

গেছো ভূত হন তারা-

গাছে যান মারা যারা।

তারা থাকে গাছ-ডালে লট্‌কে-

আর দেন ঘাড়খানা মট্‌কে।

ওঠে নামে বেয়ে গাছ-কান্ড,

দেখে ফেললেই কাজ পণ্ড।

 

তো যেসব লোকের গাছে মৃত্যু হয় তারাই গেছো ভূত হন; কিন্তু গাছে কিভাবে একজনের মৃত্যু হতে পারে? গাছ তো আর কাউকে মেরে খেয়ে ফেলতে পারে না- তো গাছের ডালে যারা ফাঁসি-টাসি দিয়ে আত্মহত্যা করেন তারাই গেছো ভূত হন। এখন যেহেতু এমন কেস গ্রামে-গঞ্জেই বেশী হয়ে থাকে তাই গেছো ভূতেদের ঠিকানাও গাঁয়েই বেশী হয় (অবিশ্যি শহরে বিজলি বাতির কল্যাণে ভুত-প্রেত আর দেখা যায়ই কোথায়)। ভূতেদের মূল কাজ লোকেদের ভয় দেখানো- গেছো ভূতেরাও তা করে থাকে। কিন্তু কিভাবে?- আঁধার রাতে একলা কোনও ব্যক্তি যখন সেই অভিশপ্ত গাছ, যেখানে গেছো ভূতের বাস, তার পাশ দিয়ে যায়- তখনই গেছো ভূত টপ্‌ করে ফাঁসিস্থ হয়ে গাছ থেকে তার সামনে ঝুলে পড়ে। ব্যাস, কেল্লা ফতে, ভয়ের চোটে সে লোক মাথা ঘুরে সেখানেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। এছাড়াও শোনা যায় যে এরা গাছ বেয়ে সরসর করে ওঠানামা করে থাকে, এবং এ সময় তারা থাকে উল্টো, অর্থাৎ তাদের মাথা থাকে নিচে এবং পা থাকে ওপরে- অনেকটা টিকটিকির মতো। ওরে বাবা রে, কি ভয়ের ব্যাপার!

 

আরও পড়ুন - কারিয়া পিরেত এর নাম শুনেছেন? জানুন এই ভূতটির কথা



গেছো ভূত


আরও পড়ুন - ‘পেত্নী’ তো অনেককেই বলে থাকেন, ভাল করে তার কথা জানুন


গেছো ভূত এর নাম শুনলেই কেন জানিনা আমার গেছোদাদার কথা মনে পড়ে যায়। গেছোদাদাকে চিনতে পারছেন তো? সেই যে সুকুমার রায়ের ‘হযবরল’ গপ্পের রুমাল, যে হয়ে গিয়েছিল বেড়াল, গেছোদাদার কথা বলেছিল। যদিও তাকে ভূত বলে পরিচয় দেওয়া হয়নি, কিন্তু মশাই, তার মধ্যে কি কম ভূতত্ত্ব ছিল? সে যে কোথায় থাকে কিছুতেই জানা যায় না, তার সাথে দেখা হবারই জো নেই-

 

যদি যাই উলুবেড়ে-

তিনি থাকেন মতিহারি,

মতিহারি গেলেও তাকে

দেখতে আমি না পারি।

থাকবেন তিনি তখন

রামকিষ্টপুর-

কষ্ট করে গেলুম সেথা,

হয়ে গেলো দুপুর।

গিয়ে শুনি গেছেন তিনি

কাশিমবাজার-

গেছোদাদার সঙ্গে দেখা

হবার নেই যো আর।

 

এই যে ইচ্ছে থাকলেও, চেষ্টা করলেও, দেখা না পাওয়া- এ যে বেজায় ভূত-ভূত একটা গন্ধ, আর এ গন্ধটা খুবই সন্দেহজনক! তাই গেছোদাদার কথা শুনলেই আমার গেছো ভূত এর কথা মনে পড়ে যায়। তবে গেছোদাদা কি আসলেই গেছো ভূত? নাকি গেছোদাদা গেছোদাদাই, গেছো ভূত আলাদা- এ আমার জানা নেই। আপনি কি জানেন? তবে কষ্ট করে আমায় একটু জানিয়ে দেবেন। 

  

আরও পড়ুন - মেছোভূত এর কথা কতটা জানেন? জানুন।



<<Previous Article            <Main Introductory Page>            Next Article>>

বৃহস্পতিবার, ১১ নভেম্বর, ২০২১

কমিকস- নেড়া ১

 নেড়ার কাণ্ডকারখানা

কমিকস- নেড়া

মজাদার সব জোকস এর ওপর নির্ভর করে আঁকা দু প্যানেল এর কমিক স্ট্রিপ ‘নেড়ার কান্ডকারখানা’। আশা করি আপনাদের ভাল লাগবে।

 

আরও দেখতে এখানে ক্লিক করুন- আমার আকা কার্টুন, ক্যারিক্যাচার কমিক্স 

 

(এই কমিক স্ট্রিপ আঁকার জন্য যদি আপনার ছোট, মজাদার কোনও জোকস জানা থাকে তা আমায় দিলে ভাল লাগবে ও সুবিধেও হবে।)

মঙ্গলবার, ৯ নভেম্বর, ২০২১

বন্ধুমামার গল্পযান (অন্তিম পর্ব)

 এখানে ক্লিক করে পড়ুন- বন্ধুমামার গল্পযান (প্রথম পর্ব)

এখানে ক্লিক করে পড়ুন- বন্ধুমামার গল্পযান (দ্বিতীয় পর্ব)

এখানে ক্লিক করে পড়ুন- বন্ধুমামার গল্পযান (তৃতীয় পর্ব)

এখানে ক্লিক করে পড়ুন- বন্ধুমামার গল্পযান (চতুর্থ পর্ব)


বন্ধুমামার গল্পযান

(পাঁচ)

কতক্ষণ অবস্থায় কাটল জানিনা, সে কয়েক সেকেন্ডও হতে পারে আবার কয়েক মিনিটও হতে পারেভয়ে, আতঙ্কে খানিকক্ষণের জন্য যেন আমাদের সময়জ্ঞান লোপ পেয়েছিলকিন্তু যখন সম্বিত ফিরল সে সময় এমন একটা ঘটনা ঘটল যার জন্য আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলুম নাহঠাৎ টলতে-টলতে একটি লোক গুহার ভেতর থেকে বেড়িয়ে এসে দড়াম করে মাটিতে পড়ে গেলঅজানা কোনও জান্তব আক্রমণে তার শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিলতাকে দেখেই বাকি লোকগুলো হাহাকার করতে করতে কোনোক্রমে তার দেহটা একটা ঘোড়ার ওপর চাপিয়ে পড়ি কি মরি করে সেখান থেকে পালিয়ে চলে গেলবুঝলুম লোকটা তাদের সঙ্গী ছিল, কিন্তু আর কিছুই বুঝতে পারলুম না


বন্ধুমামার গল্পযান (অন্তিম পর্ব)


ব্যাপারটা কী হল বল তো বুবুন?’ মামা খানিকক্ষন পরে বলে উঠলেন, ‘লোকটাই বা কে, আর ওর ওরকম অবস্থাটাই বা করল কে? কোনও মানুষ এমনটা করতে পারবে বলে তো মনে হয়নালোকটা বাঁচবে কিনা সন্দেহ


আমি মামার কথার উত্তর দেব কি, আমার নিজেরও তো সব কিছু কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছেহঠাৎ প্রচন্ড আতঙ্কে বলে উঠলুম, ‘মামা ওটা কী?’


কোথায়? কোথায়?’


ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিলকারণ আমার হাতের আঙুল যেদিকে নির্দেশ করছিল, মানে গুহার মুখের দিকে, সেদিকে গুহার ভেতর থেকে বিশাল এবং ভয়ংকর কী যেন একটা জীব বেড়িয়ে আসছিলপ্রথমে একখানা হাত, তার পর মাথা, শরীর, পা এভাবে ধীরে ধীরে পুরো পশুটা বেড়িয়ে আসলআমি এমন ভয়ানক জীব এর আগে কখনও দেখিনিসারাটা শরীরে সবজে-নীল রঙের বড় বড় লোম, চার হাতে পায়ে ভর দিয়ে চলছে, মুখখানা অনেকটা গরিলার মত, ভাঁটার মত দুটো চোখ জ্বলছে, মাথার মাঝখানে বিরাট এক শিং কাঁধে বাদুরের ডানার মত কী যেনমুখ যখন খুলছে ভেতরে বিশাল-বিশাল দাঁত ঝকঝক করছেআমরা দুজনেই বাকরুদ্ধ হয়ে জিনিসটাকে দেখতে লাগলুম


রাক্ষুসে প্রাণীটা বেড়িয়ে এসেই রাগত ভঙ্গিতে দুবার প্রচন্ড চিৎকার করে উঠললক্ষ্য করলুম, তার হাতের বুকের দু-এক জায়গায় রক্তপাত হচ্ছেএতক্ষন লক্ষ্য করিনি, গুহার মুখের পাশেই একখানা ছোট জলাশয়প্রাণীটা জলাশয়ে নেমে গেলজলাশয়টা আমাদের দিকে হওয়াতে আমরা এবার প্রাণীটাকে আরও ভাল করে দেখতে পাচ্ছিলুমলক্ষ্য করলুম প্রাণীটা জলে নেমেই কিছুটা জল খেল এবং তারপর তার ক্ষতস্থানগুলোতে জল কাঁদামাটি দিতে লাগলযতবারই সে তার ক্ষতস্থানে কাঁদা দিচ্ছিল ততবারই প্রচন্ড গর্জনে আসপাশ কাঁপিয়ে দিচ্ছিলকিছুটা শান্ত হয়ে সে জল থেকে উঠে এল, কিন্তু হঠাৎ যেন সতর্ক হয়ে গেল; এদিক সেদিক ঘোরে আর জোরে জোরে শ্বাস টেনে কী যেন বোঝার এবং খোঁজার চেষ্টা করেএই করতে-করতে সে আমাদের দিকে বেশ কয়েক কদম এগিয়ে এল


হঠাৎ অনুভব করলুম আমার হাত ধরে পেছনদিকে এক প্রচন্ড টান এবং তার সাথে চাপা গলায় মামার ধমক, ‘বুবুন চল, ছোট, পালামামা ভাগনেতে মিলে পড়ি কি মরি করে ছুট লাগালুমছুটছি তো ছুটছিই, পথ যেন আর শেষই হচ্ছে না, দম ফুরিয়ে আসছেদৌড়োতে-দৌড়োতে পাথুরে এলাকা পার করে আবার জঙ্গল এলাকায় এসে থামলুমহাঁপাতে-হাঁপাতে কান খাড়া করে মামা শোনবার চেষ্টা করলেন আমাদের পেছন-পেছন কিছু আসছে কিনানিশ্চিত হয়ে আমায় বললেন, ‘অমন হাঁ করে তাকিয়ে আছিস কেন? ব্যাটা আমাদের গন্ধ পেয়ে গিয়েছিল বোধহয়চল, এবারে পালাতে হবে, কখন পেছন-পেছন গন্ধ শুঁকতে-শুঁকতে এসে হাজির হয় বিশ্বাস নেইবলেই মামা পকেট থেকে রিমোটখানা বের করে একটা বোতামে চাপ দিলেনওমনি সেখানে শোঁ-শোঁ শব্দ করে আমাদের গল্পযান এসে হাজির হলমামা বললেন, ‘শীগগির ঢুকে পর বুবুন


আমি এক লাফে গিয়ে যানে ঢুকে বসলুমমামাও ঢুকে পড়ে তার কাজ শুরু করে দিলেনহড়াস করে ঢাকনা বন্ধ হল, আবার সেই শোঁ-শোঁ আওয়াজশ্বাসকষ্টমিষ্টি গন্ধশরীরে আচ্ছন্ন ভাবশব্দকানে তালা লাগা, সব ঠিক আগের বারের মতইএবং সব শেষে ঘুম


(ছয়)

ঘুম যখন ভাঙল তখন আমরা বন্ধুমামার ঘরে এবং মামার যন্ত্রপাতি সব নিস্তব্ধ আর মামা যথারীতি তখনও অচেতনখানিক্ষন গুম হয়ে থেকে ভাবলুম যে এতক্ষন যা দেখলুম, শুনলুম তা সত্যি না স্বপ্নচমক ভাঙল ঘরের কোনও এক টিকটিকির কর্কশ টিকটিক ডাকেতাকিয়ে দেখি মামা অলরেডি জেগে উঠে তার বর্ম, হেলমেট ইত্যাদি খোলা শুরু করে দিয়েছেনআমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সব ছেড়ে ফেল বুবুন, ওগুলোর কাজ আপাতত শেষ


জিনিসপত্র খুলতে খুলতে আমার সন্দেহের কথাটা মামার কাছে পাড়তে তিনি বললেন, ‘কথাখানা যে তুই খুব একটা ভুল বলেছিস তা নয়, আমরা স্বপ্ন দেখছিলুম এমনটাও বলাই যায়কারণ আমরা গল্পজগতে আমাদের পার্থিব শরীর নিয়ে যাইনি, সেটা সম্ভবও নয়, আমার যন্ত্র আমাদের অবচেতনের স্বত্বাকে কোনও আর এক ব্যাক্তির অবচেতনে নিয়ে গিয়ে ফেলেছিল, তাই তুই একে এক ধরনের স্বপ্নও বলতেই পারিস


তবে যাই ছিল মামা, এমন অভিজ্ঞতা আমার আগে কখনও হয়নিকিন্তু ওই ভয়ংকর জিনিসটা কী ছিল?’ আমি জিজ্ঞাসা করলুম


তা আমি কি জানিসে হয়ত লেখকের মনের কোনও এক কল্পনাঅনেক হল, এবারে তুই যা বুবুন, আমি একটু একা বসে ভাবতে চাই


মামা তোমার ওই গল্পযানে আমায় আবার চড়াবে না?’


সে হবেখ, এবার তুই তোর ঘরে যা


এক রাশ উত্তেজনা ও প্রশ্ন নিয়ে মামার ঘর থেকে বেড়িয়ে যাচ্ছি, হঠাৎ চোখ গেল টেবিলের দিকে যেখানে সেই বইখানা রাখা যেটা থেকে মামা তার যন্ত্রে তথ্য ফিড করেছিলেন ঘর থেকে বেড়িয়ে যাবার শেষ মুহূর্তে বইয়ের নামখানা পড়লুম—‘রূপকথা ও রাক্ষসের গল্প


(শেষ)


<<পড়ুন পূর্ববর্তী পর্ব<<